বাংলা একাডেমী এখন একটা নতুন কাজ পেতে যাচ্ছে। ভাষার ওপর নজরদারি রাখা। শামসুজ্জামান খান বলেছেন, “ভাষা পরিস্থিতিতে একটা নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলা একাডেমীর একটা খসড়া আইন আমরা তৈরি করেছি। সে আইনে এই সব বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। সেই আইনটি সরকারের মাধ্যমে পার্লামেন্টে পেশ করার পর যদি অনুমোদিত হয়ে আসে তাহলে এই ক্ষেত্রে আমরা যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারব।” আমরা কে কীভাবে কথা বলব, লিখব… কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ, উপন্যাস ইত্যাদি লিখব তার জন্য আইনের খসড়া করছে বাংলা একাডেমী। সেটা পাশ করবে জাতীয় সংসদ আর সেটা প্রয়োগ করবে বিচার ও নির্বাহী বিভাগ। দারুণ খবর!………….
ভাষার একটা নিজস্বতা আছে। যে জায়গার ওপর ভাষা দাঁড়ায় তার একদিকে আছে তার সামাজিক বা সামষ্টিক দিক, অন্যদিকে যিনি সেই সামাজিক ভাষাটা ব্যবহার করেন সেটা তিনি তাঁর মতো করেই ব্যবহার করেন। অবস্থা বুঝে, উদ্দেশ্য অনুযায়ী। ভাষা সেই দিক থেকে একান্তই তাঁর নিজের জিনিস। এই দিক থেকে তার একটা ‘ব্যক্তিগত’ বা ‘সৃষ্টিশীল’ দিক আছে। অর্থাৎ সামাজিক ব্যক্তি সমাজে থেকে সমাজে বাস করতে গিয়ে সামাজিক ভাষাটা তাঁর নিজের মতো করেই ব্যবহার করেন। সমাজ ও ব্যক্তির দাগচিহ্নের পর দাঁড়িয়ে ভাষার এই ব্যবহার ভাষাকে সবসময়ই সপ্রাণ রাখে। ভাষা এই সামাজিকতা ও ব্যক্তিকতার টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে নিজের গতিতে বদলায়। সেখানে কোনো আইন নাই; পুলিশ, দারোগা, র্যাপিড একশান ব্যাটালিয়ন বা বাংলা একাডেমী নাই। সেখানে যদি কারো সর্দারি আদৌ মানতেই হয় তবে তাঁরা সৃষ্টিশীল কবি ও সাহিত্যিক। বিশেষত যাঁরা সজ্ঞানে ও সচেতন ভাবে ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। দুমড়েমুচড়ে উল্টেপাল্টে ভাষার সম্ভাবনা ও সীমার নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষাই সাহিত্যের কাজ। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অতি অল্প অংশই হয়তো টেঁকে, বাকিটা ভাষার ইতিহাস হয়ে থেকে যায়। কিন্তু সমাজের এই সৃষ্টিশীল উদযাপন ও কর্মযোগকে সমূলে খুন করবার আওয়াজ যখন ওঠে তখন আতংকিত না হয়ে পারা যায় না।………
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণী এবং তাদের তাঁবেদাররা তকাকথিত ‘প্রমিত ভাষা’-কেই লেখালিখি সাহিত্য চর্চা রেডিও টেলিভিশনে কথা বলবার একমাত্র ভাষা হিসাবে আইন করে চাপিয়ে দিতে চাইছে। বাংলা সাহিত্যের এখনকার ভাষা বা ‘আধুনিক’ কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা ভাষা ছাড়া কেউ নাকি কথা বলতে পারবে না। রেডিও টেলিভিশনে, পত্রপত্রিকাতেও এই ‘প্রমিত’ ভাষাই চলবে।
আমি তরুণদের পক্ষে ভাষা-ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই আপাতত সাক্ষী মানব। রবীন্দ্রনাথ পরিষ্কারই বলেছেন যাকে আমরা সাহিত্যের ভাষা বলি আর সরকারি পণ্ডিতরা যাকে ‘প্রমিত ভাষা’ বলছেন তার ‘সূত্রপাত’ হয়েছে বিদেশের ফরমাশে এবং তার সূত্রধর হচ্ছে সংস্কৃত পণ্ডিত। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, বাংলাভাষার সঙ্গে এঁদের সম্পর্ক হচ্ছে ‘ভাসুর-ভাদ্র বউয়ের’ মতো। বাংলা ভাষা একটি সজীব প্রাণবন্ত ভাষা। কিন্তু “এই সজীব ভাষা তাঁদের কাছে ঘোমটার ভিতরে আড়ষ্ট হইয়া ছিল, সেই জন্য ইহাকে তাঁরা আমল দিলেন না। তাঁরা সংস্কৃত ব্যাকরণের হাতুড়ি পিটিয়া নিজের হাতে এমন একটা পদার্থ খাড়া করিলেন যাহার কেবল বিধিই আছে গতি নাই।”
বাংলা ভাষার এই পশ্চাত ইতিহাস নিয়ে আমার রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্র পাঠ বইতে কিছুটা আলোচনা করেছি। এখানে পুনরাবৃত্তি করব না। শুধু মনে করিয়ে দেব বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটানোর যে পথটা রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন সেটা হচ্ছে সাহেবদের ঔরসে এবং ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের গর্ভে যে বাংলা তৈরি হয়েছে তার বিপরীতে যাত্রা করা। মুখের ভাষার যে সজীব ও প্রাণবন্ত বাংলা সেই দিকেই ভাষাচর্চার অভিমুখ স্থাপন করা। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তাই করেছেন। দুই একজন অনুকরণপ্রিয় দুর্বল লেখকের কথা বাদ দিয়ে এখনকার তরুণরা ক্রিয়াপদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার বাইরে কিছু করেছেন বলে আমার মনে হয় নি। অনেকের চোখে সেটা খানিক স্বেচ্ছাচারিতা মনে হতে পারে কিন্তু ক্রিয়েটিভ লেখার ক্ষেত্রে সেটা অপরাধ নয়।
এটাও মনে রাখা দরকার রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কলকাতা হয়ে যে রূপ নিয়ে আমাদের হাতে এসেছে, তাকেই সরকারি পণ্ডিতরা এখন ‘প্রমিত বাংলা’ বলে শিরোপা দিচ্ছেন, অথচ সেটা আমাদের অনেকেরই মাতৃভাষা নয়। যেমন আমি নোয়াখালির ছেলে, নোয়াখালির ভাষাই আমার মাতৃভাষা। নোয়াখালির ভাষায় বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো অবশ্যই গান, কবিতা, কাহিনী রচিত হয়। সেইগুলোও সাহিত্য। নেয়াখালির ক্রিয়াপদ ‘প্রমিত বাংলা’-র ক্রিয়াপদের নিয়মে চলে না। বাংলাভাষা যত বেশি সাধারণ মানুষের ভাষা হয়ে উঠবে ততই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিনের ভাষা থেকে নিজের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। ক্রিয়াপদের ব্যবহারও বাদ যাবে না। কতটুকু সেই চেষ্টা সফল হবে সেটা নির্ভর করবে বাংলা ভাষার কবি-সাহিত্যিকদের শক্তির ওপর। সেই শক্তির চর্চা তো তরুণদের সাহসী প্রয়াসের মধ্যেই আগে ধরা পড়বে। বিদ্যমান ভাষার যে সামাজিক বা সামষ্টিক দিক তার সীমানা প্রসারিত করলে কতদূর সেটা লংঘন বলে পরিগণিত হবে সেটা আইন করে ঠিক করে দেবার বিষয় নয়।
তরুণদের ভাষায় ক্রিয়াপদ ব্যবহারে স্বেচ্ছাচারিতা থাকলেই তা সাহিত্যে গৃহীত হয়ে যাবে তারও কোনো কথা নাই। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার এই অধিকার মানতে হবে—এমনকি সৃষ্টিশীল স্বেচ্ছাচারিতার মূল্যও সাহিত্যের দিক থেকে অপরিসীম। যাঁরা সাহিত্যের ইতিহাস জানেন তাঁদের কাছে এইসব নতুন কোনো কথা নয়। বাংলা একাডেমীকে এই সব উদ্ভট চিন্তা বাদ দিতে হবে। বাংলা ভাষা কী রূপ নিয়ে দাঁড়াবে সেটা কাউকে আইন করে ঠিক করে দিতে হবে না। কেউ যেন স্বেচ্ছাচারিতাকেই সাহিত্যের স্বাধীনতা বলে ভুল না করে তার জন্য পরামর্শ দিতে পারে বাংলা একাডেমী। – ভাষা ব্যবহারের ওপর আইনী খবরদারী অথবা ফ্যাসিবাদের নতুন ধরণ
সূত্র: বিডিনিউজ২৪ মতামত-বিশ্লেষণ
মার্চ ৯, ২০১০

